Header Ads

রবীন্দ্রনাথ এবং এক স্বর্গীয় তীর্থভূমি থুড়ি দেবভূমি | মৃন্ময় দে


নিজের অন্তর চক্ষু দিয়ে শান্তিনিকেতনকে তুলে ধরলেন মৃন্ময় দে।

'শান্তিনিকেতন', গড়পড়তা বাঙালির এ এক অবশ্য দ্রষ্টব্য স্থান আর তাই এ নিয়ে নতুন করে কিছু লিখতে চাওয়ার অর্থ যাকে বলে ‘রবীন্দ্র পাঁচালি’ পুনরাবৃত্তি করা। তবুও আমার এ নিয়ে লিখতে বসা সম্প্রতি ঐ দেবভূমিতে গিয়ে যা আমি আমার অন্তরাত্মায় নতুন করে অনুভব করতে পেরেছি তারই কিছু বর্ণনা করার অভিপ্রায়। যা বলা যায় কবিগুরুর জন্মদিনে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য জানানোর এক ক্ষুদ্র প্রয়াসমাত্র । 
কবিগুরুর কথা ধার করে বলি, "বহু দিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে, বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে, দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু..."। আক্ষরিক অর্থেই, বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ ঘোরা হয়ে গেলেও "... দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই-পা ফেলিয়া...", রাঙা মাটির ধূলার উপর এমন তীর্থভূমি'।
যাঁদের সৃষ্টিকে নিজের অনুভবের সাথে মিশিয়ে জীবনের কঠিন ও বন্ধুর পথগুলোতে অবিচল থাকার চেষ্টা করি, আনন্দের মুহূর্তে যাঁদের সৃষ্টিকে পাশে রেখে চরম উচ্ছল হই, তাঁদের মধ্যে অন্যতম সেই মহামানবের পূণ্যভূমি ও স্বপ্নের আনন্দধাম, সেই শান্তিনিকেতন দর্শন করে অবশেষে অন্তরের আত্মশুদ্ধি ঘটালাম।

প্রথমেই রইল তাঁর বাসভূমি 'উত্তরায়ণের' কথা।
ভগবান কে? প্রকৃত সত্য এটাই যে আজ অবধি 'চর্মচক্ষে' কেউ কি ভগবান দেখেছেন??? যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে বিশেষ কিছু 'সিদ্ধ পুরুষ' তাও দেখেছেন তো সীমিত জ্ঞানে আমি এটাই বুঝি যে আমার মতো সাধারণ মানুষের কাছে ভগবান এমন এক শ্রদ্ধামিশ্রিত অনুভব যিনি তাঁর নানান সৃজনশীল কর্মকান্ডের মধ্যে দিয়ে তাঁর প্রতি এক নির্ভরতা, এক স্বতস্ফূর্ত মুগ্ধতা তৈরি করেছেন। আর তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া মন্দির ও দেবভূমি হল ভগবানের সেইসব কর্মকান্ডের অধিষ্ঠান ও লীলাভূমি।
সেই অনুভূতি হয়েছিল উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। 'উদয়ন' থেকে কোণার্ক - শ্যামলী - পুনশ্চ - উদীচী', সংস্কারের জন্য বন্ধ থাকা শ্যামলী বাদে প্রতিটা বাড়ির সামনে বা যেখানে সুযোগ হয়েছে সেখানে ভেতরে প্রবেশ করে সেইসব অনুভূতি আমি অনুভব করেছি মনের ঐ স্বতস্ফূর্ত ভাবাবেগে। যেখানে সুযোগ পেয়েছি ওঁনার ব্যবহৃত নানান সামগ্রীর সামনে বসে থেকেছি বহু সময় ধরে। মানসচক্ষে দেখতে চেয়েছি হয়তো বা এই ঠিক এই জায়গায় বসেই উঁনি বেশ কিছু অমর রচনা করে গেছেন আর নতুনভাবে অনুভব করার করেছি,
"সকল পাওয়ার মধ্যে পেয়েছি অমূল্য উপাদেয়, এমন       সম্পদ যাহা হবে মোর অক্ষয় পাথেয় ... "
ওঁনার শেষ্ঠত্ব এটাই যে 'একজীবনে এতজন পরম আত্মীয় ও সুহৃদ বিয়োগ এবং নানান অপমান ও দায়বদ্ধতার নাগপাশ ওঁনার বহুধারার সৃষ্টিকে থমকে যেতে তো দেয়েইনি বরং সেইসব সৃষ্টিকে আরও পরিশীলিত করেছে। ওঁনার নানান সৃষ্টির মধ্যেই উঁনি খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের "আনন্দধারা"র নানান উপাদান।' নানা গল্পে বর্ণিত ভগবান হিসাবে আমরা তো তাঁদেরকেই জেনেছি যাঁরা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাঁদের নানান লীলাপ্রদান থেকে বিচ্যুত হননি। তাহলে কবিগুরুই বা কেনো ভগবান হবেন না আর ওঁনার এই বাড়ি ও আশ্রম কেনো মন্দির ও দেবভূমি হয়ে থাকবে না। আমার কাছে এই প্রশ্ন ও বোধ জেগেছে বারবার। আর তাই ভক্তরা যেমন তন্ময় হয়ে একাত্মতা ও মগ্নতার সাথে ভগবানে নিবেদিত প্রাণস্বরূপ মন্দির প্রাঙ্গণে বসে থাকেন সেরকমই পবিত্রতা অনুভব করেছিলাম ঐ দেবপ্রাঙ্গণে বসে। তাই তো পড়ন্ত সূর্যাস্তের আলোয় ঐ দেবপ্রাঙ্গণ ছেড়ে চলে আসার সময়েও সেই কবিগুরুর রচনাকেই নতুনকরে অন্তরে অনুভব করেছিলাম, "সহস্র দিনের মাঝে আজিকার এই দিনখানি হয়েছে স্বতন্ত্র চিরন্তন, তুচ্ছতার বেড়া হতে মুক্তি তারে কে দিয়েছে আনি প্রত্যহের ছিঁড়েছে বন্ধন"।

পুনশ্চ ১ : এই প্রাঙ্গণেই দেখা যাবে 'ভগবানের স্বর্ণযান' অর্থাৎ সেই মোটরগাড়ি যাতে করে ১৯৪১ সালের ২৫শে জুলাই রবিঠাকুর উদয়ন গৃহ ত্যাগ করে ও তাঁর স্বপ্নের শান্তিনিকেতনকে শেষবারের মতো বিদায় জানিয়ে রেলষ্টেশনের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন এবং সেখান থেকে ট্রেনে করে জোড়াসাঁকো বাড়িতে পৌঁছেছিলেন ।

পুনশ্চ ২ : ছবি : নিজস্ব।

No comments

Powered by Blogger.